দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা পুরোপুরি বন্ধ না করে ডিজিটাল নিবন্ধন ও শৃঙ্খলিত ব্যবস্থার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রতিটি অটোরিকশায় কিউআর কোড ও ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে একটি নম্বরের অধীনে অবৈধভাবে একাধিক অটোরিকশা চালানোর সুযোগ বন্ধ করা হবে। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি ব্যবহার এবং নির্দিষ্ট এলাকাভিত্তিক অটোরিকশা চলাচলের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে ৭১ বিধিতে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানুর মনোযোগ আকর্ষণের নোটিশের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এসব কথা বলেন।
সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু তাঁর নোটিশে রাজধানীর ১৭টি সিগন্যালে চালু থাকা ৫০টি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ট্রাফিক ক্যামেরার সুফল এবং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার কারণে তৈরি হওয়া বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ট্রাফিক ক্যামেরা চালুর পর সড়কে লাল বাতি অমান্য, লেন পরিবর্তন ও অতিরিক্ত গতির মতো অনিয়ম অনেকাংশে কমেছে। তবে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা কোনো নিয়মকানুন না মেনে চলাচল করছে। এসব যানের নম্বর প্লেট না থাকায় ক্যামেরায় অনিয়ম শনাক্ত হলেও জরিমানা বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
রেহানা আক্তার রানু বলেন, ঢাকার প্রধান সড়কগুলোতেও বিপুলসংখ্যক অটোরিকশা চলাচল করছে। সঠিক কাঠামোগত নকশা না থাকায় এসব যান প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। তবে কম ভাড়া ও সহজলভ্যতার কারণে সাধারণ মানুষের কাছে অটোরিকশা জনপ্রিয়। তাই পুরোপুরি বন্ধ না করে কাঠামোগত পরিবর্তন, নম্বর প্লেট সংযোজন, চালকদের প্রশিক্ষণ ও ড্রাইভিং লাইসেন্সের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গত এক দশকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক তিন চাকার যান গ্রামীণ ও নগর পরিবহন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। কম খরচ ও সহজ যাতায়াতের কারণে সাধারণ মানুষ যেমন উপকৃত হচ্ছে, তেমনি চালক, গ্যারেজ শ্রমিক, যন্ত্রাংশ ব্যবসায়ী ও চার্জিং সেবাদাতাদের ঘিরে একটি বড় অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।
তবে দ্রুত ও অনিয়ন্ত্রিত বিস্তারের কারণে এসব যান বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, সড়ক নিরাপত্তা, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে বলে জানান তিনি।
বিদ্যুৎ ব্যবহার ও রাজস্ব ক্ষতির বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সারা দেশে আনুমানিক ৫০ থেকে ৮০ লাখ বৈদ্যুতিক তিন চাকার যান রয়েছে। এগুলো দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ ব্যবহার করে। এর বিপরীতে বৈধ চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ৩০০টি। শুধু ঢাকাতেই প্রায় ৪৮ হাজার অনানুষ্ঠানিক ও অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের কারণে প্রতিবছর সরকারের প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে। বিদ্যুতের খুঁটি থেকে অবৈধভাবে সংযোগ নিয়ে অনেক জায়গায় চার্জিং স্টেশন হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাবের কথা তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, অটোরিকশায় ব্যবহৃত সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারি এবং এর অনিরাপদ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের ফলে সীসা ও ধোঁয়া নির্গত হয়ে বায়ু, মাটি ও পানি দূষিত হচ্ছে। এর প্রভাব আশপাশের বিভিন্ন শিল্পের ওপরও পড়ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ২০২৫ সালে দেশে মোট ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ১১ জন নিহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনার ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশের সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা জড়িত ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বর্তমান আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রধান সড়কগুলোতে অটোরিকশা চলাচল নিষিদ্ধ করে ঢাকা মহানগর পুলিশ নিয়মিত অভিযান ও ডাম্পিং পরিচালনা করছে। একই সঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশ, ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি ও ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির যৌথ অভিযানে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে।
তিনি জানান, রাজধানীর ১৭টি সিগন্যালে চালু থাকা ৫০টি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ক্যামেরা থেকে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। এর ধারাবাহিকতায় তেজগাঁও ও রমনা ট্রাফিক বিভাগে আরও ২০০টি ক্যামেরা স্থাপনের কাজ চলছে। পর্যায়ক্রমে পুরো রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়ে এসব ক্যামেরা স্থাপন করা হবে।
সম্পূরক প্রশ্নে রেহানা আক্তার রানু বলেন, তিনি অটোরিকশা নিষিদ্ধ করার কথা বলেননি; বরং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে এগুলো নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, প্রতিদিন ঢাকায় অন্তত ৩০০টি নতুন অটোরিকশা যুক্ত হচ্ছে এবং প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ এসব যান চার্জে ব্যয় হচ্ছে।
তিনি অটোরিকশা জব্দ ও ডাম্পিং বন্ধ করে নির্দিষ্ট গলির সড়কে চলাচলের সুযোগ দেওয়া, সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তোলা, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের নিবন্ধন এবং এলাকাভিত্তিক জোনিং ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দেন। একই সঙ্গে সমন্বিত নীতিমালা কবে নাগাদ বাস্তবায়ন হবে, তা জানতে চান।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট বিধিবিধান ও নীতিমালা ইতোমধ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগ চূড়ান্ত করা এই নীতিমালায় অটোরিকশাচালকদের কর্মসংস্থান যাতে ব্যাহত না হয়, সে বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
তিনি জানান, নীতিমালার আওতায় ডিজিটাল নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় কিউআর কোড ও ট্র্যাকিং ব্যবস্থা থাকবে। এতে একটি নম্বরের অধীনে অবৈধভাবে একাধিক অটোরিকশা চালানোর সুযোগ থাকবে না। একই সঙ্গে সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারির পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি ব্যবহারের বিষয়েও কঠোর শর্ত থাকবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, জাতীয় স্বার্থ, সড়ক নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত এই নীতিমালার পূর্ণ বাস্তবায়ন করা হবে।
এমএস/